অনুসরণকারী

ফাইটার প্রথম পর্ব


(বিশেষ কারণবশত দিভ্যানীর নাম বদলে দেবযানী করা হল। শুধু তাই নয়, কিছু চরিত্রের নাম, জায়গার নামও পরিবর্তিত করা হয়েছে গল্পের খাতিরে। এর পরেও কোথাও মিল পেলে সেটা কাকতালীয়)

সকালবেলা জগিং সেরে রোহিত যখন বক্সিং জিমে ঢুকল ততক্ষণে দেবযানী ওয়ার্মআপ সেরে পাঞ্চিংব্যাগে প্র্যাকটিস শুরু করে দিয়েছে। সেদিকে একঝলক তাকিয়ে রোহিত ট্র্যাকস্যুটের জ্যাকেট খুলে বেঞ্চের উপর রেখে দেয়াল থেকে স্কিপিং রোপটা নামিয়ে আনলো। তারপর ধীরলয়ে স্কিপিং করতে শুরু করল। ধীরে ধীরে সেই গতি বাড়তে লাগল। আর দেবযানী, রোহিত আসার পর একটু অন্যমনস্ক হলেও পরক্ষণে মন দিল প্র্যাক্টিসে। সামনের সপ্তাহে একটা ম্যাচ আছে তার। প্রতিপক্ষ হরিয়ানার দীপালি কাটারিয়া। রোহিতের কাছে দেবযানী শুনেছে এই দীপালির শুরুটাও নাকি অনেকটা তার মতোই। হরিয়ানার একটা ছোটো গ্রাম থেকে উত্থান, তারপর ন্যাশনাল লেভেল বক্সিং-এ চ্যাম্পিয়ন হওয়া। আজ পর্যন্ত একটাও ম্যাচ নাকি হারেনি দীপালি। তবে উগ্র স্বভাব বলে একটু বদনাম আছে তার। ম্যাচ চলাকালীন নাকি একটা বুনো রাগে আচ্ছন্ন হয়ে যায় দীপালি। প্রতিপক্ষকে শুধু হারিয়ে ক্ষান্ত হয় না। বরং হারানোর পরেও এমন মার মারতে থাকে যার ফলে প্রতিপক্ষকে প্রতিবার হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। অবশ্য দীপালির এই দোর্দণ্ডপ্রতাপ স্বভাবের জন্য দায়ী তার কোচ ফৈজল কুরেশী। 

রোহিতের সময়কার এক নামকরা বক্সার ফৈজল। হরিয়ানার এক ছোটো গ্রামের বদমেজাজি, মারকুটে মেয়েটাকে ট্রেনিং দিয়ে এক নির্মম হিংস্র মুষ্টিযোদ্ধায় পরিণত করেছে সে। ক্রিমিনাল ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে আসা ফৈজলও দীপালির মতোই প্রতিপক্ষদের উপর নির্মম প্রহার করতো। একবার এক বিয়েবাড়ির নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে গিয়ে মদ্যপ অবস্থায় এক নর্তকীকে উপস্থিত অভ্যাগতদের সামনে নৃশংসভাবে ধর্ষণ করে হত্যা করে সে। সেই অপরাধে নিম্ন আদালতে তার ফাঁসী হলেও পরে উচ্চ আদালতে সেই শাস্তি পালটে যাবতজীবন কারাবাস হয়। কয়েকবছর হল জেলে ভালো ব্যবহারের জন্য সে মুক্তি পেয়েছে। আর মুক্তি পেতেই আবার আগের মতো জীবনযাপন শুরু করেছে সে। তবে একটু সংযত ভাবে। আগের মতো অত্যধিক মদ্যপান অথবা নারীসঙ্গ সে করে না। বরং দিনের একটা বিশাল অংশ সে কাটায় বক্সিং আর জিমের পেছনে। সেই মুহূর্তগুলোর কিছু অংশ ইন্সটাগ্রামে রিল হিসেবে পোস্ট করে সে। ইদানীং নাকি একটা চ্যালেঞ্জ শুরু করেছে সে। ন্যাশনাল লেভেল চ্যাম্পিয়নশিপের আগে প্রতিযোগীকে একটা নক আউট ম্যাচ খেলতে হবে তার শিষ্যা দীপালির সাথে। যদি প্রতিপক্ষ জেতে তাহলে ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপ ও আগামী Commonwealth Games-এ সেই প্রতিযোগীকে  ফৈজল নিজে ট্রেনিং দেবে। শুধু তাই নয় খেলোয়ারের যাবতীয় খরচ সে বহন করবে। কিন্তু যদি দীপালি জেতে তাহলে প্রতিপক্ষকে সারাজীবনের মতো বক্সিং ছাড়তে হবে। শুধু তাই নয়, এতদিন ধরে সে যা মেডেল-ট্রফি জিতে এসেছে, সবটাই ত্যাগ করতে হবে। 

রোহিতদের আপত্তি এই জায়গাতেই। খেলায় হার-জিত থাকেই, তাই বলে পরাজিত খেলোয়ারকে আজীবন খেলা ছেড়ে দিতে হবে, এতদিন ধরে অর্জিত কীর্তির চিহ্নস্বরূপ মেডেল-ট্রফি ত্যাগ করতে হবে এ কেমন কথা? এ নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া ও প্রেস মিডিয়ায় সরব হয়েছিল তারা। সমগ্র ভারতের বক্সার ও বক্সিং ফেডারেশন তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল। সেই প্রতিবাদের উত্তরে ফৈজল আহ্বান জানিয়েছে ওদের এই নক আউট ম্যাচে অংশগ্রহণ করার জন্য। তবে শর্ত পাল্টেছে সে। ম্যাচে যদি দেবযানী জেতে তাহলে এই নক আউট ম্যাচ চিরতরে বন্ধ করে দেবে ফৈজল। আর যদি দীপালি জেতে তাহলে শুধু দেবযানী নয়, রোহিতকেও তার বক্সিং এর সমস্ত স্মারক ত্যাগ করে বক্সিং থেকে বিদায় নিতে হবে। সারা ভারতের বক্সারদের স্বার্থে রোহিত এই বক্সিং আমন্ত্রণে সাড়া দিয়েছে। ঠিক করা হয়েছে আগামী দুমাস পর সন্ধ্যেবেলা চণ্ডীগড়ে ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। উপস্থিত থাকবেন বক্সিং ফেডারেশনের কর্তারা। তাদের সম্মুখেই দীপালির সাথে দেবযানী বক্সিং করবে। 


সেই মতো জোরদার প্রশিক্ষণ শুরু করে দিয়েছে দেবযানীরা। শানিত করে নিচ্ছে নিজের আঘাত, শুধরে নিচ্ছে নিজের ত্রুটিগুলো। তার সাথে ইউটিউবের মাধ্যমে লক্ষ্য রাখছে দীপালির প্রতিটা পদক্ষেপ আর কৌশলের উপর। রোহিতের প্রশিক্ষণে দেবযানী আস্তে আস্তে পরিণত হচ্ছে এক দক্ষ মুষ্টিযোদ্ধায়।  


স্কিপিং রোপে লাফাতে লাফাতে দেবযানীর দিকে নজর রাখছিল রোহিত। জিমের এককোণে রাখা পাঞ্চিং ব্যাগে ক্রমাগত পাঞ্চ করে যাচ্ছে মেয়েটা। প্রতিটা ঘুষির আঘাত আগের থেকে আরো জোরালো ভাবে আছড়ে পড়ছে পাঞ্চিং ব্যাগটার উপরে। ঘুষির অভিঘাতে ব্যাগটা দোল খেয়ে হাল্কা পিছিয়ে যাওয়ার পর কাছে এগিয়ে আসতেই প্রবল আক্রোশে ঘুষি চালিয়ে যাচ্ছে দেবযানী। অন্যদিন ট্র্যাকস্যুট অথবা জিম আউটফিটের উপর একটা টপ পরে প্র্যাক্টিস করলেও আজ মেয়েটার পরণে স্পোর্টস ব্রা আর একটা বক্সিং শর্টস ছাড়া আর কিছু নেই। হয়তো প্র্যাক্টিস চলাকালীন গরম লাগায় টপটা খুলে রেখেছে। ইদানীং গরমটা বেড়ে যাওয়ায় রোহিতই দেবযানীকে বলেছে হালকা ঢিলেঢালা জিমের পোশাক পড়তে। স্কিপিং করতে করতে রোহিত দেখলো দেবযানীর বডি মুভমেন্ট আর প্রহারের কৌশল দারুণ হলেও কোথাও যেন একটা খামতি থেকে যাচ্ছে। প্রতিটা ঘুষি মারার মাঝে একটু বিরতি নিচ্ছে সে। যেটা নেওয়ার কথা নয়। 


কথাগুলো ভাবতে ভাবতে রোহিতের চোখ গেল দেবযানীর পিঠের দিকে। স্পোর্টস ব্রা এর স্ট্র্যাপ বাদে দেবযানীর গোটা পিঠটাই উন্মুক্ত। মসৃণ অথচ মাংসল পিঠটা ঘামে ভিজে চকচক করছে। ঘামের ফোঁটা গড়িয়ে নামছে শিরদাঁড়ার খাজ বেয়ে নিতম্বের দিকে। চকচক করছে দেবযানীর বাহু, কোমর, ক্লিভেজ। ঘামে ভিজে শর্টস আর স্পোর্টস ব্রায়ের উপর দিয়ে বোঝা যাচ্ছে দেবযানীর দেহের আবৃত অংশ অর্থাৎ স্তন ও পাছার অবয়ব। একবছর আগে যখন দেবযানীকে বক্সিং ট্রেনিং দিতে শুরু করেছিল সে সেই সময় মেয়েটার শরীরে অত্যাধিক মেদের আধিক্য ছিল। বিশেষত ট্রাইসেপ, বাইসেপ, কোমরের সাইড অর্থাৎ লাভ হ্যান্ডেলে জমেছিল চর্বির পাতলা স্তর। তার উপর হাঁপানির টান থাকায় মেয়েটা সহজে ক্লান্ত হয়ে যেত। একবছরের কড়া পরিশ্রমের ফলে সেই মেয়ের আজ ছিপছিপে অথচ অ্যাথলেটিক ফিগার হয়ে গেছে। শাড়ি হোক বা বক্সিং এর পোশাক, যেকোনো পোশাকেই আকর্ষণীয় লাগে তাকে। অবশ্য এর পুরো কৃতিত্বটাই দেবযানীর একার। মেয়েটা অসম্ভব রকমের জেদি। সহজে হার মানে না। এই জেদটাকেই অস্ত্র করে এতদিন বক্সিং জিতে এসেছে সে।


দেবযানীর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে রোহিত টের পেল ওর শরীরটা আবার জাগ্রত হচ্ছে। দু পায়ের মাঝে থাকা সাপটা ফণা তুলে দাঁড়াতে চাইছে। ব্যাপারটা টের পেতেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল রোহিত। কিছু করার নেই, দেবযানীর সাথে ওর একটা চুক্তি হয়েছে। যতদিন পর্যন্ত দীপালির ও ফৈজলের অহংকার দেবযানী না ভাঙছে, ততদিন পর্যন্ত ওরা শারীরিক ভাবে মিলিত হবে না। হাজার প্রলোভন এলেও ওরা সেক্স করবে না। ঠিক হয়েছে যেদিন দীপালিকে দেবযানী হারাবে সেদিন রাতে রোহিতকে নিজের শরীর উজার করে দেবে সে। রোহিতও রাজি হয়ে ঠিক করেছে দীপালি আর ফৈজলকে উচিত শিক্ষা দিয়েই দেবযানীকে নিজের বীর্যে স্নান করাবে। কথাগুলো ভাবতে ভাবতে স্কিপিং থামিয়ে, স্কিপিং রোপটা যথাস্থানে রেখে দেবযানীর দিকে এগিয়ে গেল রোহিত।


*****


দেখতে দেখতে কেটে গেছে দুটো মাস, ম্যাচের জন্য দেবযানীরা প্রস্তুত। সমস্ত ত্রুটি, খামতিগুলো একে একে সংশোধন করে দেবযানী এখন লড়াইয়ের জন্য তৈরী। আজ সকাল এগারোটা নাগাদ চণ্ডীগড়ে এসেছে ওরা। উঠেছে The Paalit-এ। ঠিক হয়েছে আজ বিকেলে একটা প্রেস কনফারেন্স হবে, তারপর কাল ঠিক সন্ধে ছটার সময় অনুষ্ঠিত হবে বক্সিং ম্যাচ। তিন রাউন্ডে ম্যাচ হবে। তিনটে রাউন্ড ড্র হলে হবে ডু অর ডাই ম্যাচ। সে ম্যাচে যে জিতবে সে হবে বিজেতা। সেই কথামতো হোটেলের ব্যাঙ্কোয়েট হলে যখন দেবযানীরা পৌঁছল ততক্ষণে স্থানীয় আর কিছু নামী নিউজ চ্যানেলের সাংবাদিকরা ছাড়া আর তেমন কেউ আসেনি। ওরা হলে প্রবেশ করতেই কজন সাংবাদিক ওদের দিকে এগিয়ে এলেও রোহিতরা কায়দা করে তাদের কাটিয়ে মঞ্চের উপরে রাখা নির্দিষ্ট আসনে গিয়ে বসল। খানিকক্ষণ পরেই একে একে বক্সিং ফেডারেশন, প্রিন্ট আর ভিডিও মিডিয়ার লোকজন আসতে শুরু করল। সবার শেষে হলে ঢুকল ফৈজল কুরেশী। দেবযানী লক্ষ্য করল এতক্ষণ ঘরের মধ্যে সাংবাদিকদের, ফেডারেশনের কর্তাদের ফিসফাস, গুজুর গুজুর ফুসুর ফুসুর চললেও ফৈজলের আগমনমাত্র এক সেকেন্ডের মধ্যে সেটা থেমে গেল। গোটা ঘর লোকের ভীড়ে ঠাঁসা থাকলেও কারো মুখে কোনো কথা নেই। যেন পিন পড়লেও তার শব্দ জোরালোভাবে শোনা যাবে। 


হলে প্রবেশ করে চারদিকে একটা দাম্ভিক ও অবজ্ঞার দৃষ্টিপাত করল ফৈজল কুরেশী। তারপর ধীর অথচ অহংকারে ভরা পদক্ষেপে এগিয়ে এল মঞ্চের দিকে। আর ঠিক ওর পেছনেই প্রবেশ করল দীপালি। দীপালিকে দেখামাত্র সোজা হয়ে বসল দেবযানী। বিগত দুইমাসে এই মুখটাকে একাধিকবার ফোন, ল্যাপটপের স্ক্রিনে দেখে এসেছে সে। এই মানুষটার প্রতিটা পদক্ষেপ, প্রতিটা শারীরিকভাষা, কৌশল মুখস্থ তার। রুক্ষ কঠোর মুখমণ্ডল, হিংস্র অথচ সংযত চোখ, ছিপছিপে অথচ পেশিযুক্ত শরীর, আর্মিদের মতো ছোটো করে ছাঁটা চুল। পরণে একটা টিশার্ট আর ট্র্যাকপ্যান্ট। ফৈজলের পিছন পিছন দৃপ্ত পায়ে মঞ্চের দিকে এগিয়ে এল দীপালি। তারপর ওদের নির্দিষ্ট আসনে বসতেই প্রেস কনফারেন্স চালু হয়ে গেল। একজন সাংবাদিক মাইক হাতে প্রশ্ন করল,


— মি. বোস, আগামীকাল দেবযানী দাস আর দীপালি কাটারিয়ার মধ্যে হতে চলেছে এমন একটা ঐতিহাসিক ম্যাচ, যার উপর নির্ভর করছে ভারতীয় বক্সিং এর ভবিষ্যত। সমগ্র দেশ ও দেশের আপামর বক্সাররা তাকিয়ে আছে আপনাদের দিকে। আপনার কী মনে হয়? দেবযানী দাস পারবেন এতগুলো মানুষের বিশ্বাসের মান রাখতে? 


প্রশ্নটা শোনার পর উত্তর দিতে গিয়েও থমকে যায় রোহিত। তারপর শান্ত অথচ দীপ্তকন্ঠে বলে, “সেটার উত্তর নাহয় কালকের জন্য তোলা থাক! কাল বক্সিং রিং-এ আপনার উত্তর পেয়ে যাবেন আশা করি।”


— মি. কুরেশী, আপনার কী মনে হয়? এবারেও দীপালি বক্সিং-এ জিতবেন?


গোঁফে তা দিয়ে ফৈজল হেসে বলল, “ কোই শক? ন্যাশনাল বক্সিং চ্যাম্পিয়নশিপে দীপালি নিজের জাত চিনিয়েছে। ইসকে বাদ ভি আপকো লগতা হ্যা উসকে হার কি কোই গুঞ্জাইশ হ্যা?”

 

— মিস দেবযানী দাস, আগামীকাল আপনার ম্যাচ। আপনার কী মনে হয়? দীপালির মতো একজন হেভিওয়েট বক্সারকে আপনি হারাতে পারবেন?


প্রশ্নটা শুনে রোহিতের দিকে আড়চোখে তাকায় দেবযানী। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, “সব খেলায় হার জিত থাকেই। তবে এই ম্যাচ আমার কাছে অন্যরকম। একটু আগে আপনি বললেন না? এই ম্যাচের উপর নির্ভর করছে ভারতীয় বক্সিং এর ভবিষ্যত। সমগ্র দেশ ও দেশের আপামর বক্সাররা তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে। তাদের কথা ভেবেই আগামীকাল খেলবো আমি। এমনভাবে লড়ে যাবো যেন এটাই আমার জীবনের শেষ ম্যাচ।”


এভাবেই এক এক করে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দিতে লাগল ওরা। তারপর প্রশ্নোত্তরের পালা শেষ হলে মুখোমুখি বক্সিং এর পোজ করে দাঁড়াল। সাংবাদিকদের ক্যামেরায় উঠে গেল দুই যুযুধান প্রতিদ্বন্দ্বীর ছবি। 


কনফারেন্স থেকে ফেরার পর রুমে ফিরে এসে ফ্রেশ হওয়ার পর বাথরুম থেকে বেরিয়ে রোহিত দেখল দেবযানী বিছানার উপর অন্যমনস্ক হয়ে বসে আছে। তার চোখ মেঝেতে নিবদ্ধ। যেন গভীর কিছু একটা ভাবছে সে। রোহিত টাওয়েল দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে জিজ্ঞেস করল, “কী ব্যাপার বসে আছো যে? ফ্রেশ হয়ে নাও। এরপর প্র্যাকটিসে যেতে হবে তো!” রোহিতের কথা শোনামাত্র দেবযানীর চিন্তার জাল ছিন্ন হল। বিছানা থেকে নেমে ট্রলিব্যাগ খুলে রোহিতের আর নিজের জিমের পোশাক বের করে। বাথরুমের দিকে এগিয়ে গেল সে।


বাথরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে ওরা বেরিয়ে পড়ল জিমের উদ্দেশ্যে। ফেডারেশনের সাথে কথা বলে এই হোটেলের জিমে আর পুলে শুধুমাত্র আজকের জন্য স্পেশাল পারমিশন পেয়েছে ওরা। যদিও রোহিত বলেছে আজ আর কোনো হেভি ওয়ার্কআউট হবে না। শুধু কার্ডিও, একটু স্ট্রেচিং আর প্রতিদিনের মতো একটু পাঞ্চিং ব্যাগে বক্সিং ট্রেইনিং। তারপর কিছুক্ষণ পুলে সুইমিং সেরে সোজা রুমে রেস্ট নেবে দেবযানী। কারণ দমের জন্য সাঁতারের চেয়ে ভালো ব্যায়ামের বিকল্প নেই।  কাল সারাদিন কোথাও বেরোবার নেই। ঘরেই মেন্টালি প্রিপারেশন নেবে সে। সেই মতো হোটেলের জিমে ঢুকে প্র্যাকটিস শুরু করল ওরা। 


প্রথমে কার্ডিও, তারপর ফ্রি হ্যান্ড এক্সারসাইজ, তারপর স্ট্রেচিং, অবশেষে বক্সিং প্র্যাকটিস। প্র্যাকটিসের সময় রোহিত খেয়াল করলো দেবযানীর আজকে প্র্যাকটিসে মন নেই। অন্যদিনের মতো আজ তার প্রবল ঘুষি আছড়ে পড়ছে না পাঞ্চিং ব্যাগে। বরং আজ যেন ভীষণ অন্যমনস্ক সে। রোহিত একটু বিরক্ত হল। তারপর দেবযানীকে থামিয়ে জিজ্ঞেস করল, “প্র্যাকটিসের সময় কোথায় মন পড়ে আছে তোমার? কী এত ভাবছো? তখন থেকে? Focus Debu! focus!” রোহিতের কথায় কাজ হয়। সব চিন্তা ঝেড়ে ফেলে দেবযানী মন দেয় প্র্যাকটিসে।


একঘন্টা জিমে ঘাম ঝড়ানোর পর দেবযানীরা বেরিয়ে পড়ল পুলের উদ্দেশ্যে। পুল সেকশনে পৌঁছে পরণের পোশাক পাল্টে সুইমিং ট্রাঙ্ক পরে জলে নামল রোহিত। খানিকক্ষণ ডুব সাতার দিয়ে পুলের এপার থেকে ওপার করার পর জল থেকে উঠে পুলের পাশে বসলো সে। খানিকক্ষণ পর পোশাক পাল্টানোর রুম থেকে জিমের পোশাক পাল্টে একটা সুইমিং কস্টিউম পরে দেবযানীও বেরিয়ে এল সাঁতারের উদ্দেশ্যে। তবে রোহিতের মতো ডাইভিং বোর্ড থেকে সরাসরি জলে ঝাঁপ দিল না সে। বরং ধীর পায়ে পুলে নেমে সাঁতার শুরু করলো। প্রথমে ফ্রি স্টাইল, তারপর ব্যাকস্ট্রোক, তারপর একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে ডুব সাঁতার। এভাবেই বেশ খানিকক্ষণ জলের সাথে লড়াই করার পর একসময় জলের উপর চিত হয়ে শুয়ে ভেসে রইল দেবযানী। ওর চোখ আকাশের দিকে ন্যস্ত হয়ে রইল। যেন গভীর কোনো চিন্তায় মগ্ন সে। তবে সেই মগ্নতা বেশিক্ষণ থাকলো না। কিছুক্ষণ পরেই জল থেকে উঠে দাঁড়ালো দেবযানী। তারপর ধীরপায়ে এগিয়ে এল রোহিতের দিকে।

 

রোহিত এতক্ষণ একদৃষ্টে দেবযানীর দিকে তাকিয়েছিল। একজন দক্ষ প্রশিক্ষকের মতো লক্ষ্য করছিল জলের মধ্যে ওর শরীরের প্রতিটা মাংসপেশীর সঞ্চালনকে। কিন্তু যে মুহূর্তে দেবযানী জল থেকে উঠে দাঁড়ালো ঠিক সেই মুহূর্তে সেই দৃষ্টি বদলে গেল কামনা আর মুগ্ধতামিশ্র দৃষ্টিতে। অবশ্য দৃশ্যটা এতটাই সুন্দর আর ইরোটিক যে রোহিতের জায়গায় অন্য কেউ থাকলে সেও কামুক হয়ে পড়তো। দেবযানীর সমগ্র শরীর পুলের জলে ভিজে সপসপ করছে। পরণের টাইট সুইমসুটটা ভিজে যাওয়ায় দেবযানীর গভীর নাভী, স্তন, এমনকি দেবযানীর যোনীর ভাজ অর্থাৎ camel toe-টাও বোঝা যাচ্ছে। জল থেকে ওঠার সময় পোশাক থেকে পুলের জল চুঁইয়ে পড়লেও বর্তমানে তার অবশিষ্ঠাংশ চুঁইয়ে পড়ছে দেবযানীর দেহের অনাবৃত অংশগুলো মানে বাহু, গলা আর ফরসা পেশিবহুল পা দুটো থেকে। প্রতিটা পদক্ষেপে কেঁপে উঠছে দেবযানীর ভারী বুকদুটো। সেদিকে তাকিয়ে রোহিত টের পেল আবার ওর কামদণ্ড জেগে উঠেছে। প্যান্ট ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে বেচারা। এখনই একে শান্ত না করলে যেকোনো মুহূর্তে বীর্যের বিস্ফোরণ হয়ে যেতে পারে। কথাটা মাথায় আসতেই নিজের চোখ বন্ধ করলো রোহিত। নাহ! উত্তেজিত হলে চলবে না। এভাবে তীরে এসে তরী ডুবলে চলবে না। আর মাত্র একটা দিন। এতদিন যখন কন্ট্রোল করেছে, আর একটা দিন কষ্ট করে কন্ট্রোল করলেই হল। কালকের ম্যাচটা ভালোভাবে শেষ হলেই শান্তি। তারপর দেবযানী আর ওর মাঝে কেউ আসবে না। ম্যাচ শেষ হলেই দেবযানীকে নিয়ে সে বেরিয়ে যাবে গোয়ায় হানিমুন কাটাতে। সেখানে মনের সুখে দেবযানীকে ঠাপাবে সে। কথাগুলো ভেবে নিজের কামনাকে নিয়ন্ত্রণে আনে সে। তারপর দেবযানী আসতেই দুজনে মিলে শাওয়ার সেরে পোশাক পালটে রুমের উদ্দেশ্যে এগিয়ে যায়।


রোহিত জানতো না শুধু সে নয়, আরো একজন সেই মুহূর্তে লক্ষ্য রাখছিল দেবযানীর সমস্ত গতিবিধির উপর। দেবযানী যখন পুল থেকে উঠে রোহিতের দিকে এগিয়ে গেল সেই সময় সেই ব্যক্তিও তাকিয়েছিল দেবযানীর দেহসৌষ্ঠবের দিকে। কামুক দৃষ্টিতে চেখে নিচ্ছিল দেবযানীর দেহটাকে। দেবযানীরা চলে যেতেই সেই রহস্যময় ব্যক্তি বেরিয়ে এল আড়াল থেকে। তারপর ঢুকে গেল পুলের ড্রেসিং রুমে।

*****


রাতের বেলা খাওয়ার পর্ব মিটে যাওয়ার পর বিছানায় শোয়ার তোড়জোড় করতে গিয়ে রোহিত দেখল দেবযানী জানলার ধারের সোফায় বসে আবার অন্যমনস্ক হয়ে কি যেন একটা ভাবছে। রোহিত আর থাকতে পারল না। বিছানা তৈরি করার পর জিজ্ঞেস করলো, “তোমার ব্যাপারটা কী বলো তো? সেই বিকেলের প্রেস কনফারেন্সের পর থেকে দেখছি ভীষণভাবে অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছো। কী হয়েছে?”


দেবযানী জানলা দিয়ে বাইরের শহরটার দিকে তাকিয়েছিল। রোহিতের কথায় সম্বিত ফিরতেই আনমনে বলে উঠল, “একটা খটকা লাগছে।” রোহিত অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, 


— খটকা মানে? বুঝলাম না। কী বলতে চাইছো?


— আজ বিকেলে কনফারেন্সে দীপালিকে দেখে আপনার কোনো খটকা লাগেনি?


— না! কেন বলো তো?


— না মানে ওর চাহনি, গলার স্বর, বডি ল্যাংগুয়েজটা একটু অদ্ভুত না? সবটাতেই যেন একটা পুরুষালী ভাব প্রচ্ছন্ন। ও যে বাস্তবে একটা মেয়ে সেটা বোঝার কোনো উপায় নেই।  কোথাও যেন একটা হিসেব মিলছে না। এতদিন ওর ফাইট ফোনে দেখলেও মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ হয়নি আমার। আজ হল বলেই খটকাটা লাগছে। এই জিনিসটা আগে ভেবে দেখিনি তো!


— কী আজেবাজে বকছো? সবটাই তো মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। দীপালি মেয়ে নয়? ধুস তা কী করে হয়? মানছি ওর গলাটা একটু হাস্কি। চলনবলন দুটোই ছেলেদের মতো। তার একটা কারণ অবশ্য আছে। সাপ্লিমেন্ট আর স্টেরোয়েডের সাইড এফেক্টে ওকে পুরুষালী লাগছে। ঘনঘন anabolic-androgenic steroids নিলে ইস্ট্রোজেন হরমোন ড্রপ করে।


— সেটা আমি জানি। আমার হাঁপানির টানের জন্য এসব কিছুই আপনি আমাকে নিতে দেননি। সাধারণ সাপ্লিমেন্ট, ভিটামিন ট্যাবলেট আর এনার্জি ক্যাপসুলে সেই ঘাটতি পূরণ করেছেন। কিন্তু তাও আমার খটকাটা যাচ্ছে না। আপনি বুঝবেন না স্যার। আমরা মেয়েরা যেমন ছেলেদের স্পর্শ চিনি, তেমনই মেয়েদের স্পর্শটাও ভালো করে বুঝি। আচ্ছা আজকে প্রেস কনফারেন্সের পর যখন আমরা মানে আমি আর দীপালি যখন মুখোমুখি দাঁড়ালাম তখন একটা জিনিস আপনি নোটিস করেছিলেন? 


— কী?


দেবযানী একটু থামে তারপর রোহিতের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, “দীপালির দুপায়ের মাঝের অংশটা একটু ফোলা ছিল। মনে হচ্ছিল যেন মোটা প্যাড দিয়ে বা groin protector দিয়ে ঢাকা।”


এতক্ষণ ধরে দেবযানীর কথা চুপচাপ শুনলেও এই কথাটা শোনামাত্র হো হো করে হেসে ফেলে রোহিত। তারপর বলে, “তুমি পারোও বটে দেবযানী! দীপালি খামোখা groin protector পরে আসবে কেন? তার চেয়েও বড়ো কথা ওর groin protector লাগবেই বা কেন? এই ফ্রি টাইমে গোয়েন্দাগিরি করে করে তোমার মাথাটা একেবারে গেছে। ওভার থিঙ্কিং করতে করতে উল্টোপাল্টা কথা ভাবতে শুরু করেছো তুমি। তোমার সত্যিই বিশ্রামের দরকার দেখছি। এখন এসব বাদ দিয়ে কালকের ম্যাচে ফোকাস করো।” কথাটা বলেই ফোনের স্ক্রিনে সময় দেখে বলে, “ বাপরে! সাড়ে এগারোটা বেজে গেছে! নাহ আর দেরী করলে চলবে না। এই যে মেয়ে! ওসব চিন্তা ছেড়ে চুপচাপ বিছানায় শুয়ে একটা লম্বা ঘুম দাও দেখি। কাল কিন্তু আমাদের জন্য ভীষণ স্পেশাল দিন। গোটা দেশ আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে।” 


কথাটা বলে বিছানায় টানটান হয়ে শুয়ে পড়ে রোহিত। খানিকক্ষণ পরে গভীর ঘুমে ঢলে পড়ে সে। দেবযানী রোহিতের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার নজর রাখে জানলার বাইরে। 


(আগামী পর্বে সমাপ্ত)


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ফাইটার অন্তিম পর্ব

  পরদিন সকালে যখন রোহিতের ঘুম ভাঙলো ততক্ষণে বেশ বেলা হয়ে গেছে। হাত বাড়িয়ে বালিশের তলা থেকে ফোনটা বের করে সময়টা দেখামাত্র বিছানায় তড়াক করে উঠ...