গোটা শহরে তখন নেমে এসেছে অকালবর্ষণ। গরমের দাবদাহে দগ্ধ হওয়া রাস্তাঘাট, গাছপালা, আর কংক্রিটের শহরটা ক্রমশ অঝোর বৃষ্টিতে স্নাত হয়ে ধীর লয়ে তাপ মোচন করছে। বদ্ধ জানলার ঝাপসা কাঁচে নেমে এসেছে বৃষ্টির ছাঁট। সৃষ্টি হচ্ছে এক জলজ আলপনার। সেই আধো অন্ধকার ঘরের এককোণে দাঁড়িয়ে জানলার সেই জলছবির দিকে তাকাল ইশা। বৃষ্টির কারণে ওর পরণের পোশাক সিক্ত হওয়ায় সেটাকে আপাতত ঘরের চেয়ারে মেলে দেওয়া হয়েছে। কদিন আগে পুজোতে একটা শাড়ি কেনা হয়েছিল কল্কার কাজের জন্য। আপাতত লজ্জা নিবারণের জন্য সেটাই পরেছে ও। মাথার সিক্ত চুল ছেড়ে উন্মুক্ত পিঠ লুকোনোর ব্যর্থ চেষ্টা করার পর অবশেষে হাল ছেড়ে দিয়ে একটা বিরক্তি মাখা কন্ঠে বলে উঠলো, “ধুর! কখন যে বৃষ্টিটা থামবে কে জানে?” আমি অপলকে তাকিয়ে রইলাম ওর দিকে। আঁকার জন্য আমাকে মানুষের অ্যানাটমি গুলে খেতে হয়েছে। জানতে হয়েছে পেশির পেলবতা, ও ভঙ্গিমার রূপকে। তাছাড়া আমার জীবনে এত নারীকে নিরাবরণ অবস্থায় দেখা, আঁকা হয়েছে যে নগ্নতা আমার কাছে নতুন কিছু নয়। কিন্তু এই আধো অন্ধকার পরিবেশে ইশাকে দেখে কেন জানি না একটা উদগ্র কাম জেগে উঠল আমার মনে। ওর খোলা পিঠে লেপ্টে থাকা ভেজা চুলের ঘ্রাণ নিতে লোভ হল আমার। ইচ্ছে হল ওকে জড়িয়ে ধরতে। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হল কী লাভ? কিছু জিনিসকে নষ্ট না করাই ভালো। তার চেয়ে বরং মুহূর্তটাকে ধরে রাখলে মন্দ হয় না। বিছানায় ক্যামেরাটা রাখা ছিল। চট করে সেটা হাতে তুলে ইশাকে স্থির হয়ে দাঁড়াতে বলে লেন্স তাক করলাম আমি।
সমুদ্র ও নারীদেহ
সমুদ্রের ধারে ভেজা বালিতে খালি পায়ে হাঁটছিল পর্ণশ্রী। সমুদ্রের ঢেউ ধীর লয়ে পাড়ে এসে ভিজিয়ে দিচ্ছিল তার পা দুটো। আগেরদিন বিকেলের দিকে শ্রীলঙ্কায় আসার পর সমুদ্রসৈকতে নামার ইচ্ছে হলেও ক্লান্ত থাকার ফলে শরীর সায় দেয়নি। আজ সকালে রৌদ্রোজ্জ্বল আবহাওয়া দেখার পর আর দেরী করেনি। হোটেলের রুমেই প্রাতরাশ সেরে চট করে ব্যাগ থেকে হলুদরঙা টু পিস বিকিনিটা বের করে নিয়েছিল সে। অবশ্য বিকিনিটা পরার সময় মনে একটু কিন্তু কিন্তু ভাব ফুটে উঠেছিল তার। কে জানে আগের মতো বিকিনিতে ওকে মানাবে কিনা! আসলে লকডাউনের পর এখন আর সেই আগের মতো ছিপছিপে চাবুকের মতো ফিগার নেই তার। হাতে-পায়ে সামান্য মেদ জমেছে। আগের মতো সেই নির্মেদ সরু কোমরের জায়গায় আমদানি ঘটেছে love handle–এর। সুডৌল স্তন পরিণত হয়েছে ভরাট saggy b**bs-এ। মসৃণ চামড়ায় অঙ্কিত হয়েছে Stretch Mark–এর আল্পনা। দুরুদুরু বুকে পরণের পোশাকটা খুলে বিকিনিটা পরার পর ড্রেসিংরুমের আয়নায় নিজেকে জরীপ করে দেখার পর হাফ ছেড়েছিল পর্ণশ্রী। যাক! একটু চর্বির আধিক্য বাড়লেও বিকিনিতে মন্দ লাগছে না তাকে।
সমুদ্রে স্নান সেরে, রোদস্নান নেওয়ার পর সমুদ্রের ধারে হাঁটতে হাঁটতে সে আনমনে তাকাচ্ছিল ভেজা বালির দিকে। আর ভাবছিল আজ সকালে ভাবা কথাগুলো। সমুদ্র যতটা আকর্ষণীয় ততটাই রহস্যময়। যুগে যুগে না জানি কত মানুষ এক অমোঘ আকর্ষণে ছুটে এসে ডুব দিয়েছে সমুদ্রের গভীরে। যারা ভাগ্যবান, তারা পেয়েছে মণিমুক্তো, অমূল্য রত্নসম্ভার, অসংখ্য স্মৃতি। আর যারা দুর্ভাগ্যের শিকার, তারা হয় তলিয়ে গেছে অতল সাগরের গভীরে, নাহলে নিঃস্ব হয়ে হারিয়ে গেছে কালের গর্ভে। ঠিক নারীর দেহের মতো। নারী দেহের আকর্ষণও যে সমুদ্রের মতোই অমোঘ আর উপেক্ষারহিত। যুগে যুগে কত পুরুষ এই নারীদেহকে ভোগ করার, জয় করার অভীপ্সায় পতঙ্গের মতো ঝাঁপ দিয়েছে নারীদেহের অগ্নিতে। কেউ নারীর মতামত, ইচ্ছের তোয়াক্কা করেনি। যেন নারী একটা ভোগ্যবস্তু। যাকে জয় করে ভোগ করতে না পারলে পুরুষের পৌরুষত্ব বৃথা। তাদের ফলও ভুগতে হয়েছে হাতে নাতে। যারা নারীর সম্মুখে নতজানু হয়ে প্রেমের বাক্য দ্বারা কামনা করেছিল, ভালোবাসার বাঁধনে বন্দী করার আগে সম্মতি চেয়েছিল তাদের মনের কামনাকে ভস্মীভূত করার পর পাল্টা মায়ার বাঁধনে বন্দী করে নারী সেই সব পুরুষের অনুগামিনী হয়েছে। আর যারা বলপূর্বক জোর করে, নিজ শক্তির দ্বারা নারীকে করায়ত্ত করতে চেয়েছিল তাদেরকে মুহূর্তে পদদলিত করে কালের গর্ভে বিলীন করার পর চিরশাশ্বত, চিরযৌবনা প্রকৃতিস্বরূপা নারী এগিয়ে গেছে আগামীর দিকে।
কথাগুলো ভাবতে ভাবতে ঠোঁটে মৃদু হাসি খেলে গেল পর্ণশ্রীর। আজ হোটেলের রুম থেকে বেরোবার পর থেকে অসংখ্য দৃষ্টি যে ওকে স্পর্শ করে গেছে সেটা সে বিলক্ষণ জানে। এবং দৃষ্টিগুলোর মধ্যে কোনটা কামের, কোনটা প্রশংসার আর কোনটা হিংসার সেটাও অজানা নয় তার। কিন্তু সে আর পরোয়া করে না। লোকে দেখলে দেখুক গে! তাতে তার কিছু এসে যায় না। তবে কিছু কিছু পুরুষের চরিত্রহননে আনন্দ আছে বইকি! অনেকটা মুখোশ উন্মোচনের মতো। নেহাত দেশটা ভারতবর্ষ বলে আর শৈশব থেকে মান্ধাতা আমলের নীতি বোধের শিক্ষার বন্ধন আছে বলে এরা দেখা ছাড়া আর কিছুই করতে পারে না। বিদেশে কাম নিয়ে অতো ছুতমার্গ না থাকলেও এখানে আছে। অথচ ইতিহাস, বর্তমান সময় তলিয়ে দেখলে দেখা যাবে ভারতের চেয়ে কামাতুর দেশ আর দুটো নেই। এখানে মন্দিরে সঙ্গমের ভঙ্গিমা অঙ্কিত। ইতিহাসে বর্ণিত কামশাস্ত্র। অথচ কাজের বেলা সকলেই লাজুক, চরিত্রবান। এতবছর ধরে একাধিক সম্পর্কে জড়িয়ে পর্ণশ্রী বুঝেছে পৃথিবীতে কেউই চরিত্রবান বা ব্যতিক্রমী নয়। সুযোগ পেলে সবাই চরিত্রহীন। বাইরে না দেখালেও ভেতর ভেতর ছোকছোকানিটা থাকবেই। আর পুরুষ যতই নিজেকে চরিত্রবান ভেবে গর্ব করুক না কেন, কাঙ্ক্ষিত নারীকে সামনে পেলে সে নিজের চরিত্রকেও জলাঞ্জলী দিতে বাধ্য। ঠিক যেমন মুনি-ঋষিরা অপ্সরা দেখে মুগ্ধ হতেন। এই যে হোটেলের রুম সার্ভিসের বয়টা কাল ছোটোভাইয়ের মতো আচরণ করছিল, আজ সকালে রুম থেকে বেরোবার সময় তার দৃষ্টিতেও কাম দেখেছে সে। হয়তো... হয়তো কি, নিশ্চয়ই আজ নিজস্ব আপন মুহূর্তে তাকে কামনা করেই কামাবিষ্ট হবে ছেলেটা। হয়তো কল্পনায় তাকে ভোগ করার কথা ভেবে আত্মরতিতে মগ্ন হবে।
কথাটা মাথায় আসতেই হাসিতে বিষাদের চিহ্ন ফুটে ওঠে পর্ণশ্রীর মুখে। পৃথিবীতে শরীর সর্বস্ব পুরুষের সংখ্যাই বেশি। প্রেমিক পুরুষের বড্ড অভাব এখানে।

